কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও হেফজের মর্যাদা




বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও হেফজের মর্যাদা


ড. মাওলানা এ, কে, এম মাহবুবুর রহমান
যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন
অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর

কুরআন মজীদ সন্দেহাতীত, কালোত্তীর্ণ, চিরন্তন মহাগ্রন্থ। যার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য অলৌকিক। এ কালাম আল্লাহর নূর, নূরের তৈরী লৌহ মাহফুজে সংরক্ষিত। সেখান থেকে নূরের চ্যানেল দিয়ে কুরসি-আরশ পার হয়ে ৭০ হাজার নূরের জগত পাড়ি দিয়ে বাইতুল ইজ্জতে নূরের গোপন অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছে। সেখান থেকে নূরের ফেরেশতা রূহুল আমীন জিব্রাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে জাবালে নূর বা নূরের পাহাড়ে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূরের কালবে স্থান করে নিয়েছে। এই কুরআন তিলাওয়াতকারী মুহুর্তে এ নূরের জগতের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। এ নূরের সম্পৃক্ততা তিলাওয়াতকারীকে জান্নাতে পৌঁছায়। তবে এই তিলাওয়াত হতে হবে সহী-শুদ্ধ। মাখরাজ, সিফাত, মদ্দ, গুন্নাহ, ইজহার, ইকলাব, ইদগাম, ইখফাহ, রওম-ইশমাম সহ প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান ঠিক রেখে যার তিলাওয়াত হবে এবং তিলাওয়াতকারী যা পড়লো তা বুঝতে পারবে তার জন্যই তো জান্নাতে উঁচু মাকামের সু সংবাদ দেয়া হয়েছে। যেমন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান :-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْقَ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا  
হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান  (কেয়ামতের দিন) ছাহিবে কুরআন অর্থাৎ কুরআন হিফজকারীকে বলা হবে ‘তুমি কুরআনুল কারীম পড়তে থাক ও চড়তে থাক। আর ঠিক সেইভাবে স্পষ্ট ও ধীরে ধীরে পড়তে থাক যেভাবে দুনিয়াতে পড়তে। কেননা (জান্নাতের ভেতর) তোমার স্থান ঠিক সেখানে হবে, যেখানে তোমার শেষ আয়াতটি খতম হবে। (মসনদে আহমাদ-১১/৪০৩)

এভাবে বিশুদ্ধ ও প্রাণ জুড়ানো পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াত করেেলই কলবে কুরআনের নূর বা আলো পয়দা হয়। এ জন্যই ‘কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন’ নামের স্বার্থকতা তাদের কাজের মাঝে ফুটে উঠেছে।  যদি কুরআন তিলাওয়াত যথাযথ না হয় তাহলে এ তিলাওয়াত অভিশাপের কারণ হয়। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন :- 
رب تال للقرآن والقرآن يلعنه
অর্থাৎ বহু ক্বারী এমন আছেন যারা কুরআন পড়েন অথচ কুরআন তাকে লানত দেয়।
একটি কথা মনে রাখতে হবে কুরআন মজীদ সহী-শুদ্ধ করে পড়া প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন। কারন যে আমলটি পালন করা ফরয সে আমলটি জানা ও ফরয। আর কুরআন মজীদের কিছু অংশ নামাযে তিলাওয়াত করা ফরয। তাই প্রত্যেক মুসলমানকে সহী করে তিলাওয়াত অবশ্যই শিখতে হবে। পি এইচ পি কুরআনের আলো, কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন সহ কুরআনের খেদমতগার যত পবিত্র অনুষ্ঠান মিডিয়ার সুবাধে জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এসব অনুষ্ঠানমালা দেখেও যদি কোন মুসলমান সহী করে কুরআন তিলাওয়াত শিখতে উদ্বুদ্ধ না হয় তা হলে আল্লাহর দরবারে তাকে কঠোর জবাবদিহী করতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে কুরআন মজীদ তিলাওয়াতকারীকে দেহ-মন-মানসিকতা, নিয়ত ও দৃষ্টি দিয়ে কুরআনের নূর সাগরে ডুব দিতে হবে। দিলকে সকল ওয়াসওয়াসা থেকে খালি করে তিলাওয়াত করতে গিয়ে খেয়াল করতে হবে যে, যবান ও দেল সমান্তরাল উচ্চারণ করছে, তিলাওয়াতকারীর প্রতিটি লোমকুপ, তিলাওয়াতের জন্য জিহবা নাড়াচ্ছে, প্রতিটি লোমকুপ থেকে শব্দ বেরুচ্ছে। এভাবে তিলাওয়াতে মগ্ন হতে হতে এক সময় অবস্থা এমন হবে যে, আল্লাহই তিলাওয়াতকারীর যবানে পড়ছেন এবং শুনছেন। এ অবস্থায় পৌঁছে গেলে তিলাওয়াতকারীর জীবনের সবকিছুর যামীন আল্লাহ হয়ে যান। বাস্তবেও তাই দেখা যায়; কোন পরহেযগার হাফেজ-ক্বারীর সম্মান ও সম্পদ কোনটিরই জীবনে অভাব হয় না। আল্লাহ তায়ালাই তার সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। হাদীসে কুদসী শরীফে মহান আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন :-
عَنْ أَبِى سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ شَغَلَهُ الْقُرْآنُ وَذِكْرِى عَنْ مَسْأَلَتِى أَعْطَيْتُهُ أَفْضَلَ مَا أُعْطِى السَّائِلِينَ(سنن الترمذى-৫/১৮৪)
হযরত আবু ছাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, “কুরআন মজীদ (তিলাওয়াত, চর্চা-গবেষণা, আমলের মেহনত) যাকে আমার কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত রেখেছে আমি তাকে আমার অনুদান প্রার্থীদের চেয়েও উত্তম কিছু দান করব। (সুনানে তিরমিযী-হাদিস নং >২৯২৬)
এ পবিত্র হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হল যে, এখলাছের সাথে কুরআনের খেদমতকারীর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অবারিত নেয়ামত ও বরকতের দরজা খোলা রয়েছে।
হেফজুল কুরআন মুসলিম জাতির জন্য এক অপূর্ব নেয়ামত। ৩০ পারা কুরআনুল কারীম যে মানুষটির বক্ষে সংরক্ষিত; আর সে যদি কুরআনের নির্দেশমত আমল করে, এ কুরআন শুধু তাকে নয় তার বংশের জাহান্নাম অবধারিত এমন ১০জন লোককে সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
علي بن أبي طالب - رضي الله عنه - :قال : قال رسولُ الله -صلى الله عليه وسلم- : ্রمَن قرأَ القرآنَ فَاستظهرهُ ، فَأحَلَّ حَلالَهُ ، وحَرَّمَ حَرامَهُ ، أدْخَلَهُ الله بِهِ الجنةَ ، وشفَّعَهُ في عشرة من أَهلِ بَيتِهِ ، كُلُّهُم قد وَجَبَت لهم النارগ্ধ. أخرجه الترمذي.
অর্থ :- হযরত আলী বিন আবী তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং হিফজ করে, তারপর তাতে বর্ণিত হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজনের ব্যাপারে সুপারিশ করার সুযোগ দিবেন যাদের প্রত্যেকের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে।       (সুনানে তিরমিযী-হাদিস নং>২৯০৫) 
হাফেজে কুরআনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ প্রকারান্তরে আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর প্রতিই সম্মান প্রদর্শণ। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান,
إِنَّ مِنْ إِجْلاَلِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِى الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِى فِيهِ وَالْجَافِى عَنْهُ وَإِكْرَامَ ذِى السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ- (سنن ابى داود)
অর্থাৎ:- অবশ্যই আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শণ হচ্ছে বৃদ্ধ মুসলামানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, কুরআন সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেনা এমন কুরআন বহনকারী (হাফেজ) কে মর্যাদা দান এবং ন্যায়পরায়ন শাসকের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ।   (সুনানে আবি দাঊদ- হাদিস নং>৪৮৪৫)
আল্লাহর শুকরিয়া এই জন্য যে, বাংলাদেশের মত একটি ক্ষুদ্র ভ‚খন্ডে এত অধিকসংখ্যক হাফেজে কুরআন যা বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এ সকল হাফেজে কুরআনদের আলেম বানানোর জন্য জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবী। এরই মধ্যে ‘উলুমুল কুরআন ফাউন্ডেশন’ শুধুমাত্র হাফেজদের আলেম বানানোর জন্য স্বতন্ত্র মাদরাসা স্থাপন করেছে। পি এইচ পি গ্রæপ, কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন সহ যে সকল প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে হাফেজে কুরআনদের যোগ্যতা-প্রতিভা বিকাশের এই মহতি উদ্যোগ নিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। এ ধরনের উদ্যোগ যতবেশী হবে ততই কুরআনের আলো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা সকলের খেদমত কবুল করুন। আমীন। বি হুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন।

আহলে সুন্নাতের অতন্দ্র প্রহরী আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহ



আহলে সুন্নাতের অতন্দ্র প্রহরী আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহ

ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান
অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর
খাদেমুল খুদ্দাম, দারুল ইরফান দরবার শরীফ



প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ভবিষৎবাণী “শয়তানের দুই শিং বের হবে”। সেই শয়তানের শিং আবদুল ওহাব নজদীর তাওহীদ ও সংস্কারের আন্দোলনের নামে যখন সমগ্র বিশ্বে আল্লাহ তায়ালাকে মুজাসসাম, তিনি আরশে আজিমে চেয়ারে বসে আছেন, নবীজি আমদের মত, তার শাফায়াত ওসিলা শিরক, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হায়াতুন্নবী মানা শিরক, রওজা যেয়ারতের নিয়তে সেখানে হাজির হওয়া হারাম, মিলাদ কিয়াম বেদআত, পীর-মুরিদ শেরক, ইয়া রাসূলুল্লাহ বলা শেরক, এজিদকে রাদিআল্লাহু বলতে হবে, মাযহাব মানা শেরক, শবে বারাআত বিদআতসহ আহলুস সুন্নাহর মৌলিক আকিদার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চলছিল, তার ফাতওয়া অনুযায়ী হাজার হাজার আলেমকে ফাঁসী কাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছিল। নজদের দারইয়া এলাকার ডাকাত সর্দার ইবনে সৌদ জোর করে হারামাইন শরীফাইন দখল করে ছিল। আহলে বায়াত, উম্মাহাতুল মো’মিনীন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, শহীদানের মাযারসমূহ ভেঙ্গে চুরমাচার করেছিল। এ সময় সত্যিকারের আহলে সুন্নাতের আকিদা ও আমলকে রক্ষা করার জন্য যে মহান মুজাদ্দিদের আগমন ঘটেছিল তিনি-ই আলা হযরত হযরত আহমদ রেজা খান বেরলবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। 

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের যে আকিদা ১২ শত বছর ধরে চলে আসছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই তারা বিরত থাকেনি, বরং ওহাবী আকিদার বাইরে যারা থাকবে, তাদের হত্যা করা বৈধ বলে ফাতওয়া দিয়ে হাজার হাজার আলেম ও সুন্নী মুসলমানকে হত্যা করেছে। 

আলা হযরত মুসলিম উম্মাহর এ ক্রান্তি লগ্নে আল্লাহর প্রেম, আল্লাহর অস্তিত্ব, তাওহীদের প্রকৃত মর্ম উপস্থাপন, রাসূল প্রেম, তার প্রতি তা’জিম. তার প্রতি আদব, ইতায়াত ও ইত্তেবার স্বরূপ কেমন হবে, আহলে বায়তের প্রতি মুহাব্বত, তা’জিম ও আদব, উম্মাহাতুল মুমিনের প্রতি তা’জিম ও আদব, সাহাবায়ে কিরামের প্রতি তা’জিম ও আদব, সালেহীন তথা আল্লাহর ওলীদের প্রতি ভক্তি ও সম্মানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তাঁর লিখনিতে, বক্তব্যে, মুনাজারায়, শিক্ষা প্রশিক্ষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তারই উসিলায় সমগ্র বিশ্ব পেয়েছে প্রকৃত রাসূল প্রেমের সন্ধান। আফ্রিকায় এক কোটি লোকের অধিক রাসূল প্রেমিকের উপস্থিতিতে মিলাদ কিয়াম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনিশিয়া, ব্রুনািই, ভারত, ইরাক, মিশর, জর্ডান ও মালদ্বীপসহ দেশে দেশে যে মহা সমারোহে ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখ সালাম’ এর আওয়াজ, বাংলাদেশের চট্রগ্রামসহ সমগ্র দেশে জশনে জুলুস, রাষ্ট্রিয়ভাবে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের সরকারী নির্দেশনা। এ সব কিছুই যে আলা হযরতের ইলমী, রূহানী অবদান তা অনস্বীকার্য। 

আলা হযরতের ফাতওয়া রাজবীয়া, এক অনন্য ফাতওয়া বিশ্বকোষ। তাঁর পান্ডিত্য, ফকিহ হিসেবে তাঁর গভীরতা, মুফতি হিসেবে স্থান কাল পাত্রভেদে জটিল মাসয়ালার সমাধান পেশ করার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি নেই। কাদিয়ানী ফিরকার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত মজবুত। খতমে নবুয়্যত প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। এক কথায় আলা হযরত আহমদ রেজা খান বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একই সাথে মুফাসসির, মুফতি, মুহাদ্দিস, আদিব, নাহু শাস্ত্রবিদ, আধ্যাত্বিক চিকিৎসক, গনিতজ্ঞ, রসায়নবিদ, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী, যোগ্য শিক্ষক, উপরন্তু তিনি ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ। বাতিল আকিদার বিরুদ্ধে সঠিক মাসয়ালা উপস্থাপনে, জটিল প্রশ্নের জবাব দানে সমগ্রবিশ্বের আলেম সামাজের জন্য তিনি অলোকবর্তিকা। ফার্সি ভাষায় বলতে গেলে, 
ايات عشق است در حقيقت مشعل نور
در صبغة الله محور نگش بالاتراز حور
এশকের আয়না হকীকতে মশাল যে নূর
আল্লাহর রঙ্গে বিলীন হয়ে যেন বিহিশতী হুর।

আল্লাহ আমাদেরকে এ মহান ওলীর ফায়েজ ও বরকত নসীব করুন। আর স্মরণ করি মন থেকে কয়েকটি লাইন দিয়ে:
আল্লামা আহমদ রেযা

ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান

এমন একটি নাম
যে নামে শুনলে কাঁপে সদা
ওহাবী তামাম
লা মাযহাবী কাদিয়ানী
করে যে বদনাম।।

বর্তমান আল্লামা শুধু মুখের কথা
সত্যিকারে আল্লামা আহমদ রেযা
হাকিকত ও মা’রেফাতে উচ্চ মাকাম।।

আশেকে রাসূল বলা সহজ
দেখা ভীষণ দায়,
দেখতে হলে ফানা হও
আহমদ রেযায়
যার দামান ধরে এক নিমিষে
পাবে লা মাকান।।

যার চেহারায় সদা ভাসে
নূর নবীজির নূর
যার কবিতায় জেগে উঠে
হাসসানের সূর
কন্ঠে তাহার উচ্চারিত
জানে রহমত পে লাখ সালাম।।

#DIDS TV #IITV ONLINE #SM MULTIMIDIA

মানব প্রেমের অনন্য আদর্শ হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা


মানব প্রেমের অনন্য আদর্শ হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা

ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান
অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর
খাদেমুল খুদ্দাম, দারুল ইরফান দরবার শরীফ


যে নূরের আকর্ষণে সারা জাহান মাতওয়ারা, যে নূরের আলোতে আলোকিত আশি হাজার মাখলুক, সিরাজাম মুনীরা হিসেবে যে নূর উদ্ভাসিত, সে নূরের সরাসরি অংশ হযরত ফাতেমাতুয যাহরা বাতুল রাদিআল্লাহু আনহা। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশ ধারার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। আদর্শ থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যত নারী জান্নাতে যাবেন, সকলের নেতৃ ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ঘোষণা, ‘ফাতেমাতু সাইয়্যেদাতু নিসাই আহলিল জান্নাহ’ ফাতেমা জান্নাতবাসী নারীদের নেতৃ হবেন। হাশরের ময়দানে যখন সকল নবী রাসূল, সাহাবা, তাবেয়ীন ও আওলিয়াগণসহ সকল মানুষ সমবেত হবেন, ঘোষণা আসবে, ‘ইয়া আহলাল মাহশার, গুদ্দু আবসারাকুম ও নাককেসূ রুউসাকুম হাত্তা তামুররা ফাতেমা’, হে হাশরের ময়দানে সমবেত জ্বীন-ইনসান, সবাই চোখ বন্ধ করো, মাথা নত কর, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাশরের ময়দান অতিক্রম করা পর্যন্ত’। এ হাদীস মোতাবেক হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা কতবড় মর্যাদাবান মহীয়সী, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ তিনি সাইয়্যেদুল মুরসালিনের অস্তিত্বের অংশ। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন, ‘ফাতেমাতু বাদয়াতু মিন্নি’ ফাতেমা আমারই অংশ। তিনি ছিলেন শেরে খোদা আলী রাদিআল্লাহু আনহুর ‘স্ত্রী’, জান্নাতের যুবকদের নেতা হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমার ‘মা’। তাইতো বিশ্বকবি আশেকে রাসূল ও আহলে বাইত প্রেমিক ড. ইকবাল রহমাতুল্লাহি আলাইহ বলেছেন, 
মারইয়াম আয এক নেসবত ঈছা আযীয
আয ছে নেসবত হযরত যাহরা আযীয
নূরে চশমে রাহমাতুলিল আলামীন
আন ইমামে আউয়ালীন ও আখেরীণ।।

মারইয়াম হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এ সাথে সম্পৃক্তর কারণে সম্মানী। হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা তিন কারণে সম্মানী। তিনি ছিলেন রাহমাতুললিল আলামীনের নয়নের মনি, তিনি ছিলেন সৃষ্টির প্রথম ও শেষ ইমামের কলিজার টুকরা, তিনি ছিলেন হোসাইনের মা। 
দার নাওয়াযে যিন্দেগী সুয আয হোসাইন
আহলে হক হুররিয়্যাত আমুয আয হোসাইন
জীবনের বীনা বাজাও হোসাইনের আদর্শে
হক পন্থিগণ স্বাধীনতার সবক নাও হোসাইন থেকে।।

ফাতেমা ফতেমাই ছিলেন। ফাতেমা অর্থ মুক্ত। সকল পাপ মুক্ত, দুনিয়ার লোভ মুক্ত। তিনি ছিলেন যাহরা বা প্রস্ফুটিত জান্নাতি ফুল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তার নাম যাহরা এ জন্য যে, সে লেআল্লাহা কানাত তাযাহারুলে নুজুমু লে আহলিল আরদে’ কেননা, তার দ্বারা আকাশবাসী আলোকিত হয়েছে। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দিয়ে সুশোভিত হয়েছে। আর তা ছিল তার দুনিয়া বিমুখতা, পরহেযগারী এবং ইবাদতে প্রনান্তকর প্রচেষ্ঠার ফল। 

তিনি ছিলেন পুত:পবিত্র। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ওয়া ইউ তাহহীরাকুম তাতহীরা’ তোমাদের আল্লাহ পুত:পবিত্র করতে চান। এ পবিত্র হওয়ার ঘোষণার আওতাভূক্ত ছিলেন হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা। সমগ্র পৃথিবীতে সকল নারী সৃষ্টিগত কারনেই কিছু সময় অপবিত্র ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।কিন্তু একমাত্র, কেবল মাত্র ও শুধুমাত্র হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনাহাই কোনদিন অপবিত্র হন নি। মাসিক অপবিত্রতা ছাড়াই আল্লাহ তাকে পবিত্র সন্তান হাসান, হোসাইন ও যয়নব রাদিআল্লাহু আনহাকে দান করেছেন। তিনি ছিলেন বাতুল বা সম্পূর্ণ আলাদা। ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহার তাসবীহ, দোয়া, নামায আদায়, আখেরাতের প্রতি তার আগ্রহ, দুনিয়ার সকল মোহ মুক্ত হওয়া, সকল নারী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। 

তিনি ছিলেন ছিদ্দিকা। যিনি জীবনে মিথ্যা বলেন নি। তার আদর্শের পথে চলতে গেলে বিশ্বের কোন নারী-পুরুষ কোন দিন মিথ্যা বলা, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া সম্ভব নয়। 

তিনি ছিলেন ‘আল মুবারাকা’ বা বরকতের আধাঁর। তিনি ছিলেন আল মারদিয়া। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তষ্ট হয়েই পরকালে শাফায়াতের অধিকার দেবেন। 

তিনি ছিলেন ‘আয যাকিয়া’ বা কুলষমুক্ত। সমগ্র বিশ্বের নারী জগতে পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত মহীয়সী। তিনি ছিলেন উম্মুল আইম্মাহ বা ইমাম গণের মা। তাঁর বংশধারায় এ ধরাধমে এসেছে শতশত ইমাম।

তিনি ছিলেন ‘বীরঈনা’। মক্কার কাফের গোষ্ঠী নামাযে সিজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুড়ি এনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির ওয়া সাল্লাম ঘাড়ে রেখে দিল, ৩০/৪০ কেজি ওজনের চাপে যখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির এর নাভিশ্বাস হতে লাগলো। তখন হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা কিশোরী হয়েও সাহসীকতার বলে নিজে গিয়ে সে নাড়িভ‚ড়ি সরিয়ে দিয়েছেন। এইতো সেই ফাতেমা, যিনি ওহুদ ময়দানে পাহাড়ের পাদদেশে যখন কাফেরদের প্রচন্ড আক্রমণে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্তাক্ত। তখন তারই সহযোদ্ধা রক্ত বন্ধ করার জন্য খেজুরের চাটাই পুড়ে তার ছাইদিয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির ওয়া সাল্লাম এর গায়ে প্রলেপ দিয়ে ছিলেন।

তিনি ছিলেন মানবদরদী আদর্শ নারী। হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমা শৈশব বেলায় খুব জ্বর। কোন ঔষধে জ্বর থামছে না। অবস্থা বেগতিক দেখে হযরত আলী রাদিআল্লাহু ও ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা তিনটি নফল রোজার নিয়ত করেছেন। বিভিন্ন ব্যস্ততায় মান্নতের রোজা পালন করতে দেরী হয়ে গেল। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, রোজা রাখবেন। কিন্ত ঘরে সাহরী খাওয়ার কিছুই ছিল না। সামান্য কিছু খেয়ে রোজা রাখলেন। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু সারাদিন খেটে মাত্র কয়েকটি রুটি তৈরী করার যব পেলেন। ইফতারের আগে রুটি তৈরী হল।

হযরত হাসান ও হোসাইনকে দু’টি দিয়ে দু’জনে দুটি রুটি নিয়ে ইফতারের জন্য বসলেন, এমন সময় এক মিসকিন এসে করুন স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ঘরে কে আছে গো, আমি কয়েকদিন খাওয়া পাই নি। ক্ষুধার জালায় আমার জীবন যাচ্ছে। থাকলে কিছু দিন? হযরত আলী কিছুই বললেন না, কারণ ফাতেমা তো না খেয়ে রোজা রেখেছে। হযরত ফাতেমা হযরত আলীর দিকে তাকিয়ে মুচকী হেঁসে বললেন, আপনি যদি রাজি হন, তা হলে এ অসহায় মিসকীনটাকে রুটি দু’টি দিয়ে আমরা ছবর করি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘ওয়া আম্মাস সায়েলা ফালা তানহার’ কেউ চাইলে তাকে ফিরিয়ে দিও না। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা এর মানব প্রেম দেখে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে রুটি দু’টি মিসকীনের হাতে তুলে দিলেন। 

দ্বিতীয় দিনে সামান্য কিছু খেয়ে রোজা রাখলেন, এ দিনে সামান্য কিছু গম জোগাড় করে রুটি তৈরি করে ইফতার করতে বসলেন, এমন সময় এক ইয়াতিম অসহায় এসে কেঁদে বলল, আমি কয়েকদিন খাই নি, যদি থাকে কিছু দিন। উপবাস থেকে রোজা রেখে সারাদিন খেটে ইফতার করতে বসে এ ধরণের অবস্থায় পড়লে আমরা কি করতাম? আমরা কি একটু ভাবতে পারি, কিš‘ আহলে বাইতে রাসূল এর চরিত্র ও ধৈর্য ছিল উম্মতের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে চেয়েছে আমরা ধৈর্য ধরি, রুটি তাকে দিয়ে দিন। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু রুটি দু’টি তাকে দিয়ে দিলেন। 
তৃতীয় দিনও সামান্য কিছু খেয়ে রোযা রাখলেন। তিন দিনের উপোস দেয়ার পর হযরত আলী আর চলতে পারছেন না। তার পরেও অনেক কষ্টে কিছু যব পেলেন। রুটি তৈরী হল। তিনদিন পর ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় ইফতার করতে বসেছেন, এমন সময় একজন কয়েদি না খেয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। ঘরের দরজায় এসে করুন সুরে বলল, আমি কয়েদি ছিলাম, মাটির নিচের গর্তে আমাকে বহু দিন রেখে দেয়া হয়েছে। খাওয়া দেয়া হয় নি। ক্ষুধায় আমার জীবন যাচ্ছে। আমাকে খাওয়া দিন। হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহাকে বললেন, এ ক্ষুধার্থ ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেয়া যায় না। এই বলে রুটি গুলো কয়েদিকে দিয়ে দিলেন। লাগাতার তিন দিন না খেয়ে রোযা শেষ করলেন। আল্লাহ তায়ালা রাতেই আয়াত নাযিল করলেন, 
‘আল্লাহর মুহাব্বতে যারা মিসকীন, ইয়াতীম ও কয়েদিদের খাবার দেয়, আর বলে আমরা এ খাওয়া শুধুমাত্র আল্লাহর সš‘ষ্টির জন্য খাওয়াই, তাতে কোন প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ চাই না। নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবকে ভয় করি। যেদিন ভয়ংকর ও কষ্টকর (সূরা আদ দাহার, আয়াত ৮-১০)।

তিনি ছিলেন নারী জাতির ঈমান, আমল, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবতার আদর্শ। তাঁর পরিবারের উপর এ জন্যই প্রতি নামাযে দুরূদ পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একজন আদর্শ মা হতে হলে, হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ একজন আদর্শ মা ই পারে আদর্শ জাতি উপহার দিতে। 
তাইতো ড. ইকবাল বলেছেন,
“সীরাতে ফরযন্দহা আয উম্মাহাত+জওহারে সিদক ও ছাফা আয উম্মাহাত”। 
সন্তানের চরিত্র হয় মায়ের দ্বারা, সত্য ও সততার বীজ তৈরী হয় মায়ের কোলে। বিশ্বকবি শেখ সা’দী রহমাতুল্লাহি আলাইহ তাইতো দোয়া করেছিলেন,
“এলাহী বেহাক্কে বনি ফাতেমা, কেহ বর কওলে ঈমান কুনাম খাতেমা”
ফাতেমার বংশের উসিলায় এলাহী ঈমানী মৃত্যু যেন হয় শেষ পরিণতি। আল্লাহ আমাদেরকে এ মহান মহীয়সীর পদাংক অনুসরণকরার তাওফীক দান করুন। আমীন।।

#DIDS TV #IITV ONLINE #SM MULTIMIDIA