কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও হেফজের মর্যাদা




বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও হেফজের মর্যাদা


ড. মাওলানা এ, কে, এম মাহবুবুর রহমান
যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন
অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর

কুরআন মজীদ সন্দেহাতীত, কালোত্তীর্ণ, চিরন্তন মহাগ্রন্থ। যার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য অলৌকিক। এ কালাম আল্লাহর নূর, নূরের তৈরী লৌহ মাহফুজে সংরক্ষিত। সেখান থেকে নূরের চ্যানেল দিয়ে কুরসি-আরশ পার হয়ে ৭০ হাজার নূরের জগত পাড়ি দিয়ে বাইতুল ইজ্জতে নূরের গোপন অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছে। সেখান থেকে নূরের ফেরেশতা রূহুল আমীন জিব্রাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে জাবালে নূর বা নূরের পাহাড়ে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূরের কালবে স্থান করে নিয়েছে। এই কুরআন তিলাওয়াতকারী মুহুর্তে এ নূরের জগতের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। এ নূরের সম্পৃক্ততা তিলাওয়াতকারীকে জান্নাতে পৌঁছায়। তবে এই তিলাওয়াত হতে হবে সহী-শুদ্ধ। মাখরাজ, সিফাত, মদ্দ, গুন্নাহ, ইজহার, ইকলাব, ইদগাম, ইখফাহ, রওম-ইশমাম সহ প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান ঠিক রেখে যার তিলাওয়াত হবে এবং তিলাওয়াতকারী যা পড়লো তা বুঝতে পারবে তার জন্যই তো জান্নাতে উঁচু মাকামের সু সংবাদ দেয়া হয়েছে। যেমন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান :-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْقَ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا  
হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান  (কেয়ামতের দিন) ছাহিবে কুরআন অর্থাৎ কুরআন হিফজকারীকে বলা হবে ‘তুমি কুরআনুল কারীম পড়তে থাক ও চড়তে থাক। আর ঠিক সেইভাবে স্পষ্ট ও ধীরে ধীরে পড়তে থাক যেভাবে দুনিয়াতে পড়তে। কেননা (জান্নাতের ভেতর) তোমার স্থান ঠিক সেখানে হবে, যেখানে তোমার শেষ আয়াতটি খতম হবে। (মসনদে আহমাদ-১১/৪০৩)

এভাবে বিশুদ্ধ ও প্রাণ জুড়ানো পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াত করেেলই কলবে কুরআনের নূর বা আলো পয়দা হয়। এ জন্যই ‘কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন’ নামের স্বার্থকতা তাদের কাজের মাঝে ফুটে উঠেছে।  যদি কুরআন তিলাওয়াত যথাযথ না হয় তাহলে এ তিলাওয়াত অভিশাপের কারণ হয়। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন :- 
رب تال للقرآن والقرآن يلعنه
অর্থাৎ বহু ক্বারী এমন আছেন যারা কুরআন পড়েন অথচ কুরআন তাকে লানত দেয়।
একটি কথা মনে রাখতে হবে কুরআন মজীদ সহী-শুদ্ধ করে পড়া প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন। কারন যে আমলটি পালন করা ফরয সে আমলটি জানা ও ফরয। আর কুরআন মজীদের কিছু অংশ নামাযে তিলাওয়াত করা ফরয। তাই প্রত্যেক মুসলমানকে সহী করে তিলাওয়াত অবশ্যই শিখতে হবে। পি এইচ পি কুরআনের আলো, কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন সহ কুরআনের খেদমতগার যত পবিত্র অনুষ্ঠান মিডিয়ার সুবাধে জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এসব অনুষ্ঠানমালা দেখেও যদি কোন মুসলমান সহী করে কুরআন তিলাওয়াত শিখতে উদ্বুদ্ধ না হয় তা হলে আল্লাহর দরবারে তাকে কঠোর জবাবদিহী করতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে কুরআন মজীদ তিলাওয়াতকারীকে দেহ-মন-মানসিকতা, নিয়ত ও দৃষ্টি দিয়ে কুরআনের নূর সাগরে ডুব দিতে হবে। দিলকে সকল ওয়াসওয়াসা থেকে খালি করে তিলাওয়াত করতে গিয়ে খেয়াল করতে হবে যে, যবান ও দেল সমান্তরাল উচ্চারণ করছে, তিলাওয়াতকারীর প্রতিটি লোমকুপ, তিলাওয়াতের জন্য জিহবা নাড়াচ্ছে, প্রতিটি লোমকুপ থেকে শব্দ বেরুচ্ছে। এভাবে তিলাওয়াতে মগ্ন হতে হতে এক সময় অবস্থা এমন হবে যে, আল্লাহই তিলাওয়াতকারীর যবানে পড়ছেন এবং শুনছেন। এ অবস্থায় পৌঁছে গেলে তিলাওয়াতকারীর জীবনের সবকিছুর যামীন আল্লাহ হয়ে যান। বাস্তবেও তাই দেখা যায়; কোন পরহেযগার হাফেজ-ক্বারীর সম্মান ও সম্পদ কোনটিরই জীবনে অভাব হয় না। আল্লাহ তায়ালাই তার সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। হাদীসে কুদসী শরীফে মহান আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন :-
عَنْ أَبِى سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ شَغَلَهُ الْقُرْآنُ وَذِكْرِى عَنْ مَسْأَلَتِى أَعْطَيْتُهُ أَفْضَلَ مَا أُعْطِى السَّائِلِينَ(سنن الترمذى-৫/১৮৪)
হযরত আবু ছাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, “কুরআন মজীদ (তিলাওয়াত, চর্চা-গবেষণা, আমলের মেহনত) যাকে আমার কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত রেখেছে আমি তাকে আমার অনুদান প্রার্থীদের চেয়েও উত্তম কিছু দান করব। (সুনানে তিরমিযী-হাদিস নং >২৯২৬)
এ পবিত্র হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হল যে, এখলাছের সাথে কুরআনের খেদমতকারীর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অবারিত নেয়ামত ও বরকতের দরজা খোলা রয়েছে।
হেফজুল কুরআন মুসলিম জাতির জন্য এক অপূর্ব নেয়ামত। ৩০ পারা কুরআনুল কারীম যে মানুষটির বক্ষে সংরক্ষিত; আর সে যদি কুরআনের নির্দেশমত আমল করে, এ কুরআন শুধু তাকে নয় তার বংশের জাহান্নাম অবধারিত এমন ১০জন লোককে সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
علي بن أبي طالب - رضي الله عنه - :قال : قال رسولُ الله -صلى الله عليه وسلم- : ্রمَن قرأَ القرآنَ فَاستظهرهُ ، فَأحَلَّ حَلالَهُ ، وحَرَّمَ حَرامَهُ ، أدْخَلَهُ الله بِهِ الجنةَ ، وشفَّعَهُ في عشرة من أَهلِ بَيتِهِ ، كُلُّهُم قد وَجَبَت لهم النارগ্ধ. أخرجه الترمذي.
অর্থ :- হযরত আলী বিন আবী তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং হিফজ করে, তারপর তাতে বর্ণিত হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজনের ব্যাপারে সুপারিশ করার সুযোগ দিবেন যাদের প্রত্যেকের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে।       (সুনানে তিরমিযী-হাদিস নং>২৯০৫) 
হাফেজে কুরআনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ প্রকারান্তরে আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর প্রতিই সম্মান প্রদর্শণ। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান,
إِنَّ مِنْ إِجْلاَلِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِى الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِى فِيهِ وَالْجَافِى عَنْهُ وَإِكْرَامَ ذِى السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ- (سنن ابى داود)
অর্থাৎ:- অবশ্যই আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শণ হচ্ছে বৃদ্ধ মুসলামানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, কুরআন সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেনা এমন কুরআন বহনকারী (হাফেজ) কে মর্যাদা দান এবং ন্যায়পরায়ন শাসকের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ।   (সুনানে আবি দাঊদ- হাদিস নং>৪৮৪৫)
আল্লাহর শুকরিয়া এই জন্য যে, বাংলাদেশের মত একটি ক্ষুদ্র ভ‚খন্ডে এত অধিকসংখ্যক হাফেজে কুরআন যা বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এ সকল হাফেজে কুরআনদের আলেম বানানোর জন্য জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবী। এরই মধ্যে ‘উলুমুল কুরআন ফাউন্ডেশন’ শুধুমাত্র হাফেজদের আলেম বানানোর জন্য স্বতন্ত্র মাদরাসা স্থাপন করেছে। পি এইচ পি গ্রæপ, কুরআনের আলো ফাউন্ডেশন সহ যে সকল প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে হাফেজে কুরআনদের যোগ্যতা-প্রতিভা বিকাশের এই মহতি উদ্যোগ নিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। এ ধরনের উদ্যোগ যতবেশী হবে ততই কুরআনের আলো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা সকলের খেদমত কবুল করুন। আমীন। বি হুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন।