মানব প্রেমের অনন্য আদর্শ হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা
ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান
অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল
মাদরাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর
খাদেমুল খুদ্দাম, দারুল ইরফান দরবার শরীফ
মারইয়াম আয এক নেসবত ঈছা আযীয
আয ছে নেসবত হযরত যাহরা আযীয
নূরে চশমে রাহমাতুলিল আলামীন
আন ইমামে আউয়ালীন ও আখেরীণ।।
মারইয়াম হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এ সাথে সম্পৃক্তর কারণে সম্মানী। হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা তিন কারণে সম্মানী। তিনি ছিলেন রাহমাতুললিল আলামীনের নয়নের মনি, তিনি ছিলেন সৃষ্টির প্রথম ও শেষ ইমামের কলিজার টুকরা, তিনি ছিলেন হোসাইনের মা।
দার নাওয়াযে যিন্দেগী সুয আয হোসাইন
আহলে হক হুররিয়্যাত আমুয আয হোসাইন
জীবনের বীনা বাজাও হোসাইনের আদর্শে
হক পন্থিগণ স্বাধীনতার সবক নাও হোসাইন থেকে।।
ফাতেমা ফতেমাই ছিলেন। ফাতেমা অর্থ মুক্ত। সকল পাপ মুক্ত, দুনিয়ার লোভ মুক্ত। তিনি ছিলেন যাহরা বা প্রস্ফুটিত জান্নাতি ফুল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তার নাম যাহরা এ জন্য যে, সে লেআল্লাহা কানাত তাযাহারুলে নুজুমু লে আহলিল আরদে’ কেননা, তার দ্বারা আকাশবাসী আলোকিত হয়েছে। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দিয়ে সুশোভিত হয়েছে। আর তা ছিল তার দুনিয়া বিমুখতা, পরহেযগারী এবং ইবাদতে প্রনান্তকর প্রচেষ্ঠার ফল।
তিনি ছিলেন পুত:পবিত্র। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ওয়া ইউ তাহহীরাকুম তাতহীরা’ তোমাদের আল্লাহ পুত:পবিত্র করতে চান। এ পবিত্র হওয়ার ঘোষণার আওতাভূক্ত ছিলেন হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা। সমগ্র পৃথিবীতে সকল নারী সৃষ্টিগত কারনেই কিছু সময় অপবিত্র ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।কিন্তু একমাত্র, কেবল মাত্র ও শুধুমাত্র হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনাহাই কোনদিন অপবিত্র হন নি। মাসিক অপবিত্রতা ছাড়াই আল্লাহ তাকে পবিত্র সন্তান হাসান, হোসাইন ও যয়নব রাদিআল্লাহু আনহাকে দান করেছেন। তিনি ছিলেন বাতুল বা সম্পূর্ণ আলাদা। ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহার তাসবীহ, দোয়া, নামায আদায়, আখেরাতের প্রতি তার আগ্রহ, দুনিয়ার সকল মোহ মুক্ত হওয়া, সকল নারী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
তিনি ছিলেন ছিদ্দিকা। যিনি জীবনে মিথ্যা বলেন নি। তার আদর্শের পথে চলতে গেলে বিশ্বের কোন নারী-পুরুষ কোন দিন মিথ্যা বলা, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া সম্ভব নয়।
তিনি ছিলেন ‘আল মুবারাকা’ বা বরকতের আধাঁর। তিনি ছিলেন আল মারদিয়া। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তষ্ট হয়েই পরকালে শাফায়াতের অধিকার দেবেন।
তিনি ছিলেন ‘আয যাকিয়া’ বা কুলষমুক্ত। সমগ্র বিশ্বের নারী জগতে পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত মহীয়সী। তিনি ছিলেন উম্মুল আইম্মাহ বা ইমাম গণের মা। তাঁর বংশধারায় এ ধরাধমে এসেছে শতশত ইমাম।
তিনি ছিলেন ‘বীরঈনা’। মক্কার কাফের গোষ্ঠী নামাযে সিজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুড়ি এনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির ওয়া সাল্লাম ঘাড়ে রেখে দিল, ৩০/৪০ কেজি ওজনের চাপে যখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির এর নাভিশ্বাস হতে লাগলো। তখন হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা কিশোরী হয়েও সাহসীকতার বলে নিজে গিয়ে সে নাড়িভ‚ড়ি সরিয়ে দিয়েছেন। এইতো সেই ফাতেমা, যিনি ওহুদ ময়দানে পাহাড়ের পাদদেশে যখন কাফেরদের প্রচন্ড আক্রমণে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্তাক্ত। তখন তারই সহযোদ্ধা রক্ত বন্ধ করার জন্য খেজুরের চাটাই পুড়ে তার ছাইদিয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহির ওয়া সাল্লাম এর গায়ে প্রলেপ দিয়ে ছিলেন।
তিনি ছিলেন মানবদরদী আদর্শ নারী। হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমা শৈশব বেলায় খুব জ্বর। কোন ঔষধে জ্বর থামছে না। অবস্থা বেগতিক দেখে হযরত আলী রাদিআল্লাহু ও ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা তিনটি নফল রোজার নিয়ত করেছেন। বিভিন্ন ব্যস্ততায় মান্নতের রোজা পালন করতে দেরী হয়ে গেল। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, রোজা রাখবেন। কিন্ত ঘরে সাহরী খাওয়ার কিছুই ছিল না। সামান্য কিছু খেয়ে রোজা রাখলেন। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু সারাদিন খেটে মাত্র কয়েকটি রুটি তৈরী করার যব পেলেন। ইফতারের আগে রুটি তৈরী হল।
হযরত হাসান ও হোসাইনকে দু’টি দিয়ে দু’জনে দুটি রুটি নিয়ে ইফতারের জন্য বসলেন, এমন সময় এক মিসকিন এসে করুন স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ঘরে কে আছে গো, আমি কয়েকদিন খাওয়া পাই নি। ক্ষুধার জালায় আমার জীবন যাচ্ছে। থাকলে কিছু দিন? হযরত আলী কিছুই বললেন না, কারণ ফাতেমা তো না খেয়ে রোজা রেখেছে। হযরত ফাতেমা হযরত আলীর দিকে তাকিয়ে মুচকী হেঁসে বললেন, আপনি যদি রাজি হন, তা হলে এ অসহায় মিসকীনটাকে রুটি দু’টি দিয়ে আমরা ছবর করি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘ওয়া আম্মাস সায়েলা ফালা তানহার’ কেউ চাইলে তাকে ফিরিয়ে দিও না। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা এর মানব প্রেম দেখে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে রুটি দু’টি মিসকীনের হাতে তুলে দিলেন।
দ্বিতীয় দিনে সামান্য কিছু খেয়ে রোজা রাখলেন, এ দিনে সামান্য কিছু গম জোগাড় করে রুটি তৈরি করে ইফতার করতে বসলেন, এমন সময় এক ইয়াতিম অসহায় এসে কেঁদে বলল, আমি কয়েকদিন খাই নি, যদি থাকে কিছু দিন। উপবাস থেকে রোজা রেখে সারাদিন খেটে ইফতার করতে বসে এ ধরণের অবস্থায় পড়লে আমরা কি করতাম? আমরা কি একটু ভাবতে পারি, কিš‘ আহলে বাইতে রাসূল এর চরিত্র ও ধৈর্য ছিল উম্মতের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে চেয়েছে আমরা ধৈর্য ধরি, রুটি তাকে দিয়ে দিন। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু রুটি দু’টি তাকে দিয়ে দিলেন।
তৃতীয় দিনও সামান্য কিছু খেয়ে রোযা রাখলেন। তিন দিনের উপোস দেয়ার পর হযরত আলী আর চলতে পারছেন না। তার পরেও অনেক কষ্টে কিছু যব পেলেন। রুটি তৈরী হল। তিনদিন পর ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় ইফতার করতে বসেছেন, এমন সময় একজন কয়েদি না খেয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। ঘরের দরজায় এসে করুন সুরে বলল, আমি কয়েদি ছিলাম, মাটির নিচের গর্তে আমাকে বহু দিন রেখে দেয়া হয়েছে। খাওয়া দেয়া হয় নি। ক্ষুধায় আমার জীবন যাচ্ছে। আমাকে খাওয়া দিন। হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহাকে বললেন, এ ক্ষুধার্থ ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেয়া যায় না। এই বলে রুটি গুলো কয়েদিকে দিয়ে দিলেন। লাগাতার তিন দিন না খেয়ে রোযা শেষ করলেন। আল্লাহ তায়ালা রাতেই আয়াত নাযিল করলেন,
‘আল্লাহর মুহাব্বতে যারা মিসকীন, ইয়াতীম ও কয়েদিদের খাবার দেয়, আর বলে আমরা এ খাওয়া শুধুমাত্র আল্লাহর সš‘ষ্টির জন্য খাওয়াই, তাতে কোন প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ চাই না। নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবকে ভয় করি। যেদিন ভয়ংকর ও কষ্টকর (সূরা আদ দাহার, আয়াত ৮-১০)।
তিনি ছিলেন নারী জাতির ঈমান, আমল, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবতার আদর্শ। তাঁর পরিবারের উপর এ জন্যই প্রতি নামাযে দুরূদ পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একজন আদর্শ মা হতে হলে, হযরত ফাতেমা যাহরা রাদিআল্লাহু আনহাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ একজন আদর্শ মা ই পারে আদর্শ জাতি উপহার দিতে।
তাইতো ড. ইকবাল বলেছেন,
“সীরাতে ফরযন্দহা আয উম্মাহাত+জওহারে সিদক ও ছাফা আয উম্মাহাত”।
সন্তানের চরিত্র হয় মায়ের দ্বারা, সত্য ও সততার বীজ তৈরী হয় মায়ের কোলে। বিশ্বকবি শেখ সা’দী রহমাতুল্লাহি আলাইহ তাইতো দোয়া করেছিলেন,
“এলাহী বেহাক্কে বনি ফাতেমা, কেহ বর কওলে ঈমান কুনাম খাতেমা”
ফাতেমার বংশের উসিলায় এলাহী ঈমানী মৃত্যু যেন হয় শেষ পরিণতি। আল্লাহ আমাদেরকে এ মহান মহীয়সীর পদাংক অনুসরণকরার তাওফীক দান করুন। আমীন।।
#DIDS TV #IITV ONLINE #SM MULTIMIDIA